Angikar Paribar

স্বপ্নের একবছর- পৃথিবীর পাঠশালা

ঠিক করেছিলাম একটা গল্প লিখব। এই সময়ের গল্প, না পাওয়া ভালোবাসার গল্প, পরিযায়ী শ্রমিকের গল্প, বিক্রি হওয়া সুন্দরবনের গল্প, আগুনে ঝলসে যাওয়া অযোধ্যার গল্প, বেকারত্বের গল্প, ঠিক করে রাগ টাও না করতে পারার গল্প। আকাশ ছুঁতে চাওয়ার গল্প, নদীর মত বয়ে যাওয়ার গল্প, অসীম স্বপ্নের গল্প….

তার পর আর কী, বেরিয়ে পড়লাম খাতা আর পেনসিল নিয়ে গল্পের শব্দ কুড়াতে, এখনো চলছে সে গল্প সেলাইয়ের কাজ। বছরের পর বছর। সাগর থেকে পাহাড়। গ্রাম থেকে নগর। গলি গলি ঘুরে। কখনো রান্নাঘর, কখনো পাঠশালা, কখনো কালো ঝড়ের পরে নতুন ভোরের নির্মাণে সামাজিক সংহতি…. চেয়েও পারিনি থেমে যেতে। বুঝলাম, থামবেও না এই লড়াই, লেখক বদলাবে, বদলে যাবে নাম, বদলে যাবে ভাষা। তাও বয়ে চলবে এ গল্প….

লকডাউনে দিন-আনি-দিন-খাই মানুষেরা দারুন এক অসুবিধায় পড়েছিলেন, প্রথমে আমফান, পরে ইয়াস এসে বেশ কিছু অঞ্চলে সেই অসুবিধাকেই আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়। রেশন-ত্রিপল-ওষুধ বা পিপলস কিচেনের মধ্যে দিয়ে সেসব জায়গায় আমরা যখন পৌঁছনোর চেষ্টা করছিলাম তখন একটা কথা বারবার ঘুরেফিরে মাথায় এসে উঁকি মারছিল। লকডাউন বা আমফানে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়েছেন বটে, কিন্তু এসবের আগে তাদের দিনগুলি দারুণ কিছু কাটছিল, এমনটা নয়। একবার কলাইডাঙ্গাতে রেশন বিতরন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকে আসছিলেন রেশনের জন্যে। দিতে না পারার জন্য আমরা সকলের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছিলাম। এত খারাপ সত্যি জীবনে কম অনুভব করেছি। “এত দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই, দিলেও তো একদিনের জন্যই দিতেন। তার থেকে ভালো কিছু একটা করতে পারেন।” বললেন রেশন না পাওয়াদের মধ্যেই একজন। তাঁর বলায় শুধু অনুরোধ ছিল না, একটা ঝাঁঝ ছিল, একটা সমালোচনা ছিল। সেই সমালোচনা থেকেই মনের ভেতর নতুন ভাবনায়, নতুন কিছু করে তোলার জেদ চেপে যায়….
শুরু হল পৃথিবীর পাঠশালা।

কিছু পথ চলার কোনও শেষ হয় না। আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের এই চলাও আদতে অন্তহীন। তার মধ্যেও কিছু মাইলস্টোন আসে একটু জিরিয়ে নেওয়ার, একটু আনন্দ করার। পৃথিবীর পাঠশালার একবছর পূর্তিটা সেরকমই একটা মাইলস্টোন।
Quarantine Student Youth Network এর সহযোগিতায় এবং অঙ্গীকার পরিবারের পরিচালনায় পাত্রসায়র ও ইন্দাস ব্লকে মোট পাঠশালা রয়েছে তিনটি। একটি আদিবাসী গ্রাম কলাইডাঙ্গাতে, একটি পাত্রসায়েরের কালঞ্জয় মন্দিরের পাশে, অন্যটি পাশের ব্লক ইন্দাস এর গোবিন্দপুরে। গত একবছর ধরে এই পাঠশালা গুলির কাজ চলছে। যার উদ্দেশ্য হলো আর্থিক দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা পরিবার গুলির কাছে শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য করা এবং ধারাবাহিক সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন আঙ্গিকে শিক্ষা লাভ।

বর্তমানে ওই তিনটি পাঠশালায় রয়েছে 195 জন ছাত্র ছাত্রী। এই উদ্যোগ টি আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্র ছাত্রী দের মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্বাভাবিক ভাবেই পরিবারের আর্থিক সঙ্কট পড়ুয়াদের পড়াশোনায় নানা ধরণের বাধা সৃষ্টি করে। আমরা, পৃথিবীর পাঠশালা, পড়ুয়াদের কাছে বই-খাতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে যথাসম্ভব এই বাধা দূর করার চেষ্টা করছি। এছাড়া করোনা সচেতনতার প্রচারে আমরা নিয়মিত মাস্ক ও স্যানিটাইজার বাচ্চাদের দিয়ে থাকি।

দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কে আমাদের সমাজ পৃথিবীর পাঠশালা থেকে অনেক কিছু পেয়ে থাকে। করোনা আবহে বাচ্চাদের উৎসাহে গ্রামে গ্রামে এলাকা জীবাণু মুক্ত করার কাজটি যেমন করা হয়, তেমনই একইভাবে প্রাণ প্রকৃতির রক্ষার্থে পাঠশালার ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বছরের বিভিন্ন সময়ে বৃক্ষ রোপন কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়।এছাড়া পানীয় জল সংরক্ষণের জন্য পাঠশালার ছাত্র ছাত্রীরা সচেতনতার প্রচার করে থাকে।

কেবল পুঁথিগত শিক্ষা নয়, বেঁচে থাকতে এবং বাঁচিয়ে রাখতে জীবনের শিক্ষালাভই হলো পৃথিবীর পাঠশালার মূল উদ্দেশ্য। আর এই শিক্ষাদানের জন্য রয়েছে 11জন শিক্ষক। ছবি কথা বলে কি না জানা নেই। তবে আপনারা ভিডিওতে যে ছবিগুলো দেখছেন তা অনেকগুলো মানুষের সততা,ধৈর্য,ইচ্ছেশক্তি এবং সারাজীবনের শিক্ষাকে সার্থক করে তোলে। প্রকৃত শিক্ষার মানে যারা বোঝে তারাই প্রকৃত শিক্ষা দিক, তাদের প্রথাগতভাবে শিক্ষক হতে হবে না। তারা কেউ চাষ করতে ছুটে যাক,কেউ লিখে যাক সারাদিন,কেউ ল্যাবে গবেষণা করুক, কেউ চাকুরীর আশায় পড়তে বসুক সন্ধ্যাবেলা। কিন্তু সারাদিনে অনেকবারই তাদের মন চলে যায় পাঠশালাতে। এই মানুষগুলোকে কুর্নিশ। যারা রোজ রাতে স্বপ্ন নিয়ে ভাবেন, আর কোনো একদিন সেই স্বপ্ন ঠিক বাস্তবতা পায়।

স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে যারা কোনো সীমানা নির্দিষ্ট করেনা, তাদের চোখে বারবার ধরা পড়ে যায় নতুন পথ, ভিন্ন ঠিকানা। তাই বলে কি গন্তব্য বদলে যায়? স্বপ্নের প্রথম অঙ্কুর থেকে নজর সরে যেতে পারে অন্যত্র? একেবারেই নয়।

জানি একদিন স্কুল খুলবে। আবার আবার করে ভাব, বকুনি, গল্পরা ফিরবে। থামবে না শুধু স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে আরও স্বপ্ন দেখা। থামবেনা পৃথিবীর পাঠশালা। পাঠশালার নির্মাণ ছিল আমাদের দেখা আকাশচুম্বী স্বপ্নের প্রথম ধাপ। এখন সে একবছরের গণ্ডি পার করেছে। এরপর শুধুই স্বপ্নপূরণের ধারাবাহিকতা। পাঠশালা ছাপিয়ে এবার গোটা জাতির উত্থানের স্বপ্ন। ধাপে ধাপে জানাব আপনাদের।

We will bring Change. From our homes to the rest of the society.
And just like Robert Frost we too believe in the words.
“But I have promises to keep.
And miles to go before i sleep.
Miles to go before i sleep”